পুজোর আর মাত্র হপ্তাখানেক বাকি। কলমবাগানের সেন বাড়িতে এই প্রথম দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়েছে। সেই উপলক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে ঠাকুর দালান, বাড়ির ঈশান কোণে। সেখানে জোরকদমে চলছে প্রতিমা গড়ার কাজ।
জমিদার রাধাকান্ত সেনের ছেলে শ্রীকান্ত রেলের বড় অফিসার ছিলেন। সাহেবদের হুকুম মেনে চলা তাঁর ধাতে সইলো না। চাকরি ছেড়ে নিজস্ব কোম্পানি খুললেন। তাঁর সাধের টিম্বার কোম্পানিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন দুই ছেলে অনন্ত আর দিগন্ত। এঁরাই বর্তমানে সেন বাড়ির কর্তা। বড়ভাই অনন্ত-র ছেলে রূপু আর ছোটভাই দিগন্ত-র মেয়ে পুপু-হরিহর আত্মা।
রূপু ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে চেয়ে আছে ঠাকুর দালানের দিকে। সে একবারের জন্যও ওদিকে পা বাড়ায় নি। তার অভিধানে একমাত্র ইষ্টদেব-কার্ল মার্কস। চোখ সরিয়ে নিল রূপু। শান বাঁধানো পুকুরের জলে পড়ন্ত সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে। এ যেন তার সাধের রঙ্গোলি। মন ভালো হয়ে যায় তার। পাশের জামগাছ থেকে কে যেন হঠাৎ বলে উঠল-বউ কথা কও! একটা সরু ডালে বসে দুটো শালিক ক্যাঁচরম্যাচর শব্দ করে ঘাড় বেঁকিয়ে রূপুকে স্বাগত জানালো। সে আপন মনে হেসে ওঠে। আলো-আঁধারের লুকোচুরি খেলার মধ্যে দিয়ে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। বাতাসে ভেসে আসছে গুড়ের নাড়ুর গন্ধ। নিশ্চয়ই মা-কাকিমণিরা রান্নাঘরে নাড়ু পাকাতে বসেছে। জিভে জল চলে এল রূপুর। জামার পকেট থেকে সিগারেট এবং লাইটার বের করতে গিয়ে হতাশ হলো সে। এমন সময় সে শুনতে পেল,
-দাদা! এই দাদা...কোথায় গেলি? এদিকে আয় দেখে যা...।
সকাল থেকেই চাকর-বাকরদের আনাগোনা শুরু হয়েছে পুপুর ঘরে। নরক! নরক! এ বাড়িতে কোনো প্রাইভেসি আছে? নামেই ওর ঘর। যখন তখন হুটহাট করে লোকজন ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। কেউ ঘর মুছছে, কেউ বা চেয়ার-টেবিল সরাচ্ছে, আবার কেউ এসে ঘরের মধ্যে সুগন্ধি ছড়িয়ে যাচ্ছে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে যেন উৎসব উৎসব ভাব। পুপু রাতে পাতলা একটা নাইটি পরে শুয়েছিল। এখনও সেটাই ওর পরনে রয়েছে। অথচ লোকগুলোর সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। তারা তাদের কাজ করে চলেছে আপন মনে। অস্বস্তি হচ্ছিল পুপুর।
-মা! ও মা...এদিকে এসো তো একবার।
কেউ কোনো জবাব দেয় না। কিছুক্ষণ পরে খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকলেন শর্মিলা। পুপু ঠোঁট নাড়ে,
-মা, বাড়িতে কি আমার কোনো প্রাইভেসি...
-ওসব কথা থাক। এখন দয়া করে খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো।
-ওসব কথা থাক। এখন দয়া করে খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো।
ভাতের থালাটা টেবিলের ওপর রেখে তিনি চলে গেলেন। পুপুর খেতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু না খেলে মাথা ঘোরে। অতৃপ্তি নিয়েও সে ভাত খায়। খাওয়ার পর বড্ড ঘুম পায়। সে ঘুমিয়ে পড়ে। পুপুর ঘুম ভাঙলো যখন, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। লাইট জ্বলছে। ঘরের দেওয়ালে রং করা হয়েছে। পুপুর হঠাৎ ছবি আঁকার ইচ্ছা হলো। সে ব্যাগ থেকে রং-ব্রাশ নিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করল। এক সময় দেওয়াল ভরে গেল একটা ডিঙি নৌকা, নদী আর ডাঙ্গায় বসে থাকা দুটো ছেলেমেয়েতে! পুপুর খুউব ভলো লাগছিল। সে উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে ওঠে,
-দাদা! এই দাদা...কোথায় গেলি? এদিকে আয় দেখে যা...।
-ওয়াও! ইট'স রিয়েলি গ্রেট। খুউব সুন্দর হয়েছে।
রূপু, পুপুর পিঠে হাত রাখে। পুপুর চোখ উজ্জ্বল হয়।
-তোর পছন্দ হয়েছে? আমি জানতাম তুই লাইক করবিই। এই দ্যাখ...এটা তুই আর ওটা আমি।
রূপু বোনের মুখটা দুহাতে ধরে কপালে চুমু খায়!
-তোকে খুউব মিষ্টি লাগছে।
-তোকেও।
-ওষুধ খেয়েছিস?
-তোকেও।
-ওষুধ খেয়েছিস?
এবার পুপু রূপুর কাছ থেকে ছিটকে সরে আসে।
-ওষুধ কেন খাবো? আমি তো সুস্থ। দাদা, তুইও তো ওদের মতো কথা বলছিস!
-জনতাম তুই ওষুধ খাবি না। এদিকে আয়।
-জনতাম তুই ওষুধ খাবি না। এদিকে আয়।
সে শিশি থেকে এক ঢাকনি তরল ঢালল।
-এটা খেয়ে নে বুনু।
পুপু একভাবে তাকিয়ে থাকে দাদার মুখের দিকে। ওর চুলগুলো এলোমেলো। চোখের নিচে কালি। হঠাৎ হেসে ওঠে।
-ঠিক আছে। তুই বলছিস যখন...
এগিয়ে এসে ওষুধ খায়। তারপর আচমকা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। দু'হাতে জাপটে ধরে রূপুকে।
-তুই খু-উ-ব ভালো! কেন তুই আমাকে এত ভালোবাসিস? কেউ তো আমাকে চায় না। তবু তুই...
-চুপ! একদম চুপ। এখন এসব কথা নয়। ফের কাঁদবি তো আমি চলে যাবো।
-না! জানিস...আমার এখানে থাকতে একদম ভলো লাগে না। তুই বিশ্বাস কর আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। আমি বাড়ি থেকে বেরোতে পারিনা। সারাদিন ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চায় সবাই...ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেয় চুপি চুপি...।
-চুপ! একদম চুপ। এখন এসব কথা নয়। ফের কাঁদবি তো আমি চলে যাবো।
-না! জানিস...আমার এখানে থাকতে একদম ভলো লাগে না। তুই বিশ্বাস কর আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। আমি বাড়ি থেকে বেরোতে পারিনা। সারাদিন ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চায় সবাই...ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেয় চুপি চুপি...।
রূপু দীর্ঘশ্বাস ফেলে। করুণ চোখে তাকায় বোনের দিকে।
-আমি জানি বুনু। তোকে কেউ বুঝল না। আমি তো চেষ্টা করেছিলাম বাট...আই অ্যাম হেল্পলেস ডিয়ার।
রূপু জানলা দিয়ে চোখ রাখে বাইরে। উঠোনে একদল ঢাকি জড়ো হয়েছে বায়নার জন্য। ঢাকের কাঠিতে একটার পর একটা বোল ছন্দ তৈরি করছে। মনটা উদাস হয়ে আসে।
-দাদা! পুজো এসে গেল অথচ কোনো ফিল-ই হচ্ছে না! এমনকি বাড়িতে পুজো হচ্ছে, তাও কিচ্ছু ভলো লাগছে না। তোর মনে আছে আমরা ছোটবেলায় পুজোর সময় কী করতাম?
রূপু, পুপুর চোখে চোখ রাখে। পুপু ফিরে যায় অতীতের ফেলে আসা গলিতে। নতুন জামা-কাপড়, প্যাণ্ডেলে হুড়োহুড়ি, নদীর ধারের সেই কাশবন, বাতাসে বাজির গন্ধ, চরণামৃত, হোমাগ্নি, পুষ্পাঞ্জলি, মেলা, ফুচকা, ঘুড়ি-ভোকাট্টা!
-দাদা! আই মিস দোজ ডেইজ ব্যাডলি!...আই ওয়ান্ট দোজ ডেইজ ব্যাক। চুপ করে আছিস কেন? বল...পারবি না ফিরিয়ে দিতে?
রূপু দৃষ্টি সরিয়ে নেয়, বাইরে তাকায়।
-লুক অ্যাট মি! আমার চোখে চোখ রেখে বল, পারবি না ফিরিয়ে দিতে?
রূপু ঘোরে। ওর চোখদুটো ভিজে। অস্ফুটে ঠোঁট নাড়ল,
-পারব। আয়...চলে আয় আমার সঙ্গে।
নিচে মহড়া চলছে বাজনার। সেন বাড়ির কর্তারা ঝালিয়ে নিচ্ছেন ঢাকিদের দক্ষতা। ঢাকের শব্দের আড়ালে দুই ভাই-বোন চুপিসারে বেরিয়ে এল বারান্দায়। এগিয়ে গেল ব্যালকনির দিকে।
ধূপ-ধুনো নিয়ে দোতলায় উঠে এলেন শর্মিলা। বাতাসে ধুনোর গন্ধ মিশে তৈরি একটা অদ্ভুত আবেশ শরীর-মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। বাদুড়ের মতো ঝুলে থাকতে থাকতে ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে গেল। নাড়ুর গুড় জাল দিতে গিয়ে দেরি হয়ে গেছে শর্মিলার। তিনি মেয়ের ঘরে ঢুকে অবাক হলেন। পশ্চিমের দেওয়ালজুড়ে ছবি। আজই রং করা হয়েছে। স্বামী জানলে আর দেখতে হবে না! পুপুর এই খামখেয়ালিপনার জবাব তো তাঁকেই দিতে হয়। কর্তারা তো মেয়েটাকে আসাইলামে পাঠাতে চেয়েছিলেন। শুধুমাত্র তাঁর জেদেই মেয়েকে বাড়িতে রাখা হয়েছে। হাজার হোক মেয়ে তো। কাছ ছাড়া করতে মন চায় না। এইরকম কত ঘটনা ঘটে পুপুকে নিয়ে। সবদিক সামলাতে সামলাতে শর্মিলা জেরবার হয়ে গেছেন। তিনি এই মুহূর্তে পুপুকে ঘরের মধ্যে দেখতে পেলেন না। হয়ত বাথরুমে গেছে। চিন্তার মেঘ সরিয়ে তিনি ধুনোর ধোঁয়া ছড়িয়ে একে একে সমস্ত দেব-দেবীর ছবিতে ধূপ দেখালেন। এবং শেষে তিনি রূপুর ছবির সামনে দাঁড়ালেন। রূপু হাসছে। কপালে চন্দনের ফোঁটা, ছবির ফ্রেমে মালা। আজ রূপুর জন্মদিন। বেঁচে থাকলে তার পঁচিশ বছর পূর্ণ হতো!
দু-বছর আগে খড়গপুর আই. আই. টি. থেকে ছুটিতে বাড়ি ফেরার সময় সিগন্যাল পোস্টে বারি খেয়ে ট্রেন থেকে ছিটকে পড়েছিল রূপু। মাথার খুলিটা দু-টুকরো হয়ে গিয়েছিল। পুপু এই ধাক্কা সহ্য করতে পারেনি। সে মানতেই চায় না রূপু নেই। পুপুর বি. এ. শেষ হলো না। এখন সে উন্মাদ!
ভাবনায় ছেদ পড়ল শর্মিলার। বাইরে থেকে কাদের চিৎকার যেন ভেসে আসছে! ঢাকের শব্দও থেমে গেছে। হঠাৎ-ই তাঁর বুকটা ধড়াস করে উঠল! তিনি পড়িমরি করে ছুটলেন ব্যালকনির দিকে। ঈষৎ ঝুঁকে আবছা আলোতে দেখলেন-উঠোনে ভিড় জমে গেছে! মাঝখানটা ফাঁকা! পুপু পড়ে আছে উপুড় হয়ে। মাথাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে! শর্মিলার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল! মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগলো। ক্রমশ চোখের সামনেটা অন্ধকার হয়ে এল।
---------------

No comments:
Post a Comment