মাখন সিংহের বাড়ির ইছামতী লাগোয়া সিঁড়ির দুইদিকে দুটো হাতির মাথা আর লম্বা শুঁড় ছিল। ইছামতীর ধারের বাঁধানো চেয়ার বা হাতির মাথার পরে বসে থাকতাম। অলস সকালে বা দুপুরে বসে থাকতাম। মাঝে মাঝে বোটের ব্রিজের পরে দেখতাম ছাতা মাথায় আসছেন এক জন লম্বা মানুষ। দেখে আনন্দে মন নেচে উঠত। কাছে এলে ভুল ভাঙত। নাঃ, মানুষটি তো আমার স্যার নন। যাঃ! ও মা! তার একটু পরেই দেখি সত্যিই স্যার আসছেন বোটের ব্রিজ দিয়ে ঠিক ওই ভাবেই ছাতা মাথায় ধীর গতিতে। কী টেলিপ্যাথি! ছুট্টে যেতাম তাঁর কাছে। যত প্রগলভতা তাঁর সঙ্গেই তো আমার!
#
বয়সে খুব বড়ো ছিলেন না আমার থেকে। কত হবে? এই ৭-৮ বছরের বড়ো হয়ত। বিরাট নিম্ন মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির জ্যেষ্ঠ সন্তান। ফিজিক্সে অনার্স। কিন্তু ভাই বোনদের কথা ভেবে এম এস সি আর করেননি। ইউনিভার্সিটি চিঠি দিয়ে ডেকেছিল। মার শেষ সম্বলটুকু নিয়ে গিয়ে ইউনিভার্সিটির করিডরে দীর্ঘক্ষণ পায়চারি করেও ভর্তি না হয়ে চলে এসেছিলেন। ভাইবোনদের জন্যে এই আত্মত্যাগ ভাইবোনেরা কিন্তু ভোলেনি। তাই তিনি ভাইবোনদের কাছে ও আপামর ছাত্র ছাত্রীদের কাছে আজও ব্যক্তিত্বে উজ্জ্বল।
#
আমাকে পড়াতে এসে ইচ্ছে করে বলতেন, এই অঙ্কটা কিন্তু গার্লস স্কুলে ফার্স্ট গার্ল করে দিয়েছে। তুই পারবি? আমি দ্বিগুণ উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। হ্যাঁ, তিনি ফিজিক্সের টিচার হয়েও ফিজিক্স, ম্যাথস, কেমিস্ট্রি তিনটেই পড়াতেন আমাকে। কারণ উনি জানতেন তিনজন টিচার রাখার ক্ষমতা নেই আমার বাবার। সেই জন্যে নিজের স্কুলের শিক্ষক না হয়েও তিনি আজও আমার প্রিয়তম মাস্টারমশাই।
#
বাহাত্তর-তিয়াত্তর। বনগাঁ রাতে বিপজ্জনক। ছয়ঘরিয়ার দিকটায় তো সমাজবিরোধীদের অবাধ বিচরণ। উনি পড়াচ্ছেন। রাত প্রায় দশটা। আমাদের হুঁশ নেই। বাবা বাইরে পায়চারি করছেন, আর মাঝেমাঝে বলছেন, গৌর, অনেক রাত হল। তোমাদের ও দিকটা ভালো না। এবার বাড়ি যাও। স্যার বলছেন, এই তো দাদা, এই অঙ্কটা করিয়েই উঠছি।
#
আজকাল কজন এরকম মাস্টারমশাইএর কথা বলতে পারবে যাঁকে স্মরণ করলে এমনিই মাথা নত হয়ে আসে? প্রণাম স্যার (শ্রী গৌর কাশ্যপী)। দীর্ঘদিন বাঁচুন।
( আমি জানি আপনি এ লেখা পড়বেন না। কারণ আপনি ফেসবুকে নেই। তবু ইচ্ছে হল গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোটা শিক্ষক দিবসেই করে ফেলি)
----------------
চন্দন ঘোষ
বারাসাত

No comments:
Post a Comment